ইরানের ম্যাচ ঘিরে লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রবাসী ইরানিদের বিক্ষোভ
ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইরানের ম্যাচ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষোভে অংশ নেন বহু ইরান বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। নিজ দেশের জাতীয় দলকে সমর্থন জানাতে আসলেও অনেকেই একই সঙ্গে ইরানের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
সোমবার সন্ধ্যায় স্টেডিয়ামের আশপাশে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড। কেউ সরকারবিরোধী বার্তা লেখা পোশাক পরে এসেছিলেন, আবার কেউ বহন করছিলেন ইরানের জাতীয় পতাকা। অনেকের দাবি ছিল, রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, তবে অন্য একটি অংশ সরকারের নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেয়।
প্রতিবাদকারীরা বিশেষ করে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। তাঁদের অভিযোগ, ভিন্নমত দমনে তেহরান দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে।
এর একদিন আগে ইরানের জাতীয় ফুটবল দল মেক্সিকোর টিহুয়ানায় অবস্থিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায়। দলটির লস অ্যাঞ্জেলেসে আগমনের পরপরই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতার খবর সামনে আসে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রবাসী ইরানি সম্প্রদায়ের বসবাস। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর বহু ইরানি দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ফলে শহরটিতে ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মতপার্থক্য দীর্ঘদিনের।
ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে সেই বিভাজন আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে ছিল জাতীয় দলকে সমর্থনের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ। ফলে অনেক প্রবাসী ইরানি দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থানে পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, স্টেডিয়ামের বাইরে কয়েকশ বিক্ষোভকারী সমবেত হয়েছিলেন। তাঁরা পতাকা প্রদর্শন, সঙ্গীত পরিবেশন এবং স্লোগানের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। কেউ কেউ জানান, তাঁরা ম্যাচটি উপভোগ করতে চান না, কারণ তাঁদের মতে জাতীয় দলকে সমর্থন করা বর্তমান সরকারের প্রতি সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। আবার অন্যরা খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন এবং তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বিপ্লব-পূর্ব ইরানের ঐতিহ্যবাহী পতাকা বহন করেন।
ম্যাচ চলাকালে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। এ কারণে ইরানি কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানিয়েছিল, অননুমোদিত পতাকা বা রাজনৈতিক স্লোগান পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে।
এদিকে ফিফা প্রতিযোগিতার মাঠ ও স্টেডিয়ামে রাজনৈতিক বার্তা, প্রতীক কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ পোশাক প্রদর্শনের ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
স্টেডিয়ামের ভেতরে অনেক দর্শককে সিংহ ও সূর্যচিহ্নযুক্ত পুরোনো ইরানি পতাকা নিয়ে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কেউ টি-শার্টে সেই প্রতীক ব্যবহার করেছেন, আবার কেউ নিজ আসন থেকে পতাকা উড়িয়ে সমর্থন জানান।
পুরোনো ইরানি পতাকার নকশা সংবলিত পোশাক পরে আসা দর্শকদের একজন ফরহাদ জাফরগাদ বলেন, বর্তমান জাতীয় দল জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করে না বলে তিনি মনে করেন। তাই তিনি প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডকে সমর্থনের বিষয়টিও বিবেচনা করছিলেন।
অন্যদিকে ৫৭ বছর বয়সী মেহেদি জাফারি জাতীয় দলের জার্সি পরে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হন। তিনি বলেন, রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের ফুটবল দলকে সমর্থন করতেই তিনি মাঠে এসেছেন। তাঁর মতে, জাতীয় দলকে ঘিরে সবাইকে একত্রিত হওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ইরানের ফুটবলাররা শেষ পর্যন্ত মাঠে নামেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগে দেশটির সরকার আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন তখন হতাহতের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে
লাইক
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
হাসি
0
বিস্ময়
0
দুক্ষ
0
রাগ
0
মন্তব্য করুন (০)