সারের ভর্তুকির বড় অংশ পাচ্ছেন বড় জমির মালিকরা, বলছে বিশ্বব্যাংক

১৬ জুন ২০২৬ - ১৫:২০
সংবাদ শুনুন প্লে করতে ক্লিক করুন
সারের ভর্তুকির বড় অংশ পাচ্ছেন বড় জমির মালিকরা, বলছে বিশ্বব্যাংক
সারের ভর্তুকির বড় অংশ পাচ্ছেন বড় জমির মালিকরা, বলছে বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশে কৃষি খাতে সরকারের সবচেয়ে বড় সহায়তা কর্মসূচিগুলোর একটি হলো সারের ভর্তুকি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশই এই খাতে ব্যয় হয়। তবে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভর্তুকির সুবিধা সব কৃষকের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। দেশের সবচেয়ে বেশি জমির মালিক ২০ শতাংশ কৃষক সারের ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক সুবিধা ভোগ করছেন, বিপরীতে নিচের ৪০ শতাংশ কৃষকের ভাগে আসছে মাত্র ১৫ শতাংশ।

সোমবার রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংক তাদের নতুন গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় মানসম্মত প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দেশের কৃষি খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে এবং মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় এক-দশমাংশ এই খাতে বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হারও প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

এদিকে দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসছে। এখন ভোক্তাদের চাহিদা শুধু ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ফল, সবজি, মাছ, মাংস, ডিম ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু সরকারি ব্যয়ের বড় অংশ এখনো ভর্তুকি ও ধান উৎপাদনকেন্দ্রিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ সেবা, আধুনিক সেচব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো তুলনামূলকভাবে কম অর্থায়ন পাচ্ছে। ফলে কৃষির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সারের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রা অনুযায়ী সুষম সার ব্যবহার করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় কোনো উপাদান বেশি, আবার কোনোটি কম প্রয়োগ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য হ্রাসে কৃষি খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, খাদ্যচাহিদার পরিবর্তন, সীমিত সরকারি সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কারণে সার সরবরাহ ও মূল্যের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এসব পরিস্থিতি কৃষি সহায়তা ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো সামনে এনে দিয়েছে।

তার মতে, কৃষি সহায়তা প্রদানের পদ্ধতিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি ব্যয়কে আরও উৎপাদনমুখী খাতে স্থানান্তর করা গেলে দেশের কৃষি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও টেকসই হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষকদের আয় বৃদ্ধির সুযোগও বাড়বে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের মোট আবাদযোগ্য জমির প্রায় ৭২ শতাংশেই ধান চাষ হয় এবং কৃষি ভর্তুকির প্রায় ৮০ শতাংশ এই খাতে ব্যয় করা হয়। অথচ প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, শাকসবজি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের মতো খাতগুলোতে আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা আরও বেশি।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে বিশ্বব্যাংক কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। স্বল্পমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাড়ানো, কৃষকদের পরামর্শসেবা শক্তিশালী করা এবং ফার্মারস কার্ড ও ই-ভাউচার চালুর মাধ্যমে সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে কৃষি সহায়তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যে বিনিয়োগ এবং দরিদ্র কৃষকদের জন্য আরও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিবেদনের সহলেখক মনসুর আহমেদের মতে, সারের ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আধুনিক ও লক্ষ্যভিত্তিক করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রকৃত প্রয়োজন থাকা কৃষকদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে।

সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে

লাইক লাইক 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
হাসি হাসি 0
বিস্ময় বিস্ময় 0
দুক্ষ দুক্ষ 0
রাগ রাগ 0

মন্তব্য করুন ()

User