মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ধাক্কা: ইরানের কৌশল কি ইসরায়েল বাদে সব জায়গায় সফল

০৬ নভেম্বর ২০২৬ - ২০:৩৬
5 মি. পড়ার সময়
সংবাদ শুনুন প্লে করতে ক্লিক করুন
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ধাক্কা: ইরানের কৌশল কি ইসরায়েল বাদে সব জায়গায় সফল
ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দলের ধাক্কা খাওয়ার পর নিজেদের উল্লাস ও সন্তোষের কথা লুকায়নি তেহরান। দেশটির সংসদ স্পিকার থেকে শুরু করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এবং বিভিন্ন দেশের ইরানি দূতাবাসগুলো এই ফলাফলের পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের প্রধান বার্তা হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ ও যুদ্ধনীতিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ওয়াশিংটনের কৌশল ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

​এর মধ্যে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক প্রকাশভঙ্গি দেখা গেছে ভারতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসের পক্ষ থেকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করে তারা, যেখানে হোয়াইট হাউসের কর্মীদের অচেতন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি ডাস্টবিনে ফেলে দিতে দেখা যায়। ওই ডাস্টবিনের গায়ে লেখা ছিল ‘বিপজ্জনক বর্জ্য’।

​ইরানের এই উদযাপনের পেছনে মূল কারণটি মূলত কৌশলগত সফলতা। এর আগে তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটল। চলমান সংঘাতে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হলেও টিকে থাকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কৌশল শেষ পর্যন্ত কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

​দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও কৌশল

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সাজিয়েছিল ইরান। দীর্ঘ দুই দশকের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এই ছক তৈরি করে, যা দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির বক্তব্যেও স্পষ্ট হয়েছে।

​তেহরান ভালোভাবেই জানত যে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি মার্কিন ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম নয়। ফলে মার্কিন ভোটারদের ওপর যুদ্ধের প্রভাব ফেলার দুটি প্রধান পথ ছিল—সেনা হতাহতের ঘটনা ঘটানো এবং সাধারণ করদাতাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। হোয়াইট হাউসের দায়িত্বে যেই থাকুন না কেন, ভোটারদের অসন্তুষ্ট করা গেলে তার রাজনৈতিক চাপ সরকারের ওপর পড়া অবশ্যম্ভাবী।

​চলতি বছরের সংঘাতে ঠিক এই কৌশলটিই সফলভাবে প্রয়োগ করেছে তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব আরব দেশ এবং বাইরের কয়েকটি রাষ্ট্রেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তারা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতে সবচেয়ে বেশি হামলা চালানো হয়, যার ফলে ওয়াশিংটনের ওপর উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। গত এপ্রিলে ট্রাম্প যৌথ সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তু বানায় তেহরান।

​পেন্টাগনের ক্ষয়ক্ষতি ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ২৬টি ঘাঁটি এবং সামরিক সরঞ্জাম রাখার স্থাপনা লক্ষ্য করে মোট ১১৫টি হামলা চালায় তেহরান। ধারাবাহিক এসব হামলার মুখে পড়ে মার্কিন পেন্টাগন সীমান্ত এলাকা থেকে বিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং যোগাযোগ সরঞ্জামসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপকরণ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

​ইরানি হামলায় মার্কিন সেনাদের মধ্যেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। অক্টোবর মাসের শেষ নাগাদ যুদ্ধসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ২৩ জন সেনা নিহত এবং ৮৬৫ জন আহত হন। মার্কিন জনমনে এই ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব কতটা পড়েছে, তা নিশ্চিত না হলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে ইরান নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে যে সফল হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

​বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি গত আট মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও সারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন অর্থনীতিও এর প্রভাবের বাইরে নয়, যার জেরে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। ঠিক এই ফলটিই চেয়েছিল তেহরান। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা দীর্ঘায়িত করে এবং শেষ পর্যন্ত সফলও হয়।

​নির্বাচনের দিন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। এছাড়া প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোটার জানান, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভোটের পরপরই ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও রিপাবলিকান পার্টির এই পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক পরিণতিকে দায়ী করেন।

​ইসরায়েলের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ চিত্র

আরব মিত্র দেশগুলো বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়লেও ইসরায়েল তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত ছিল। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় কোনো রাজনৈতিক দায় তৈরি করতে পারেনি। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টা আঘাতের পরও ইসরায়েলি জনগণের মাঝে যুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থন কমেনি। যুদ্ধ শুরুর এক মাস পর তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি ইহুদি নাগরিক সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সংঘাতে যাওয়া উচিত।

​ইসরায়েলের এই অনমনীয় মনোভাব ইরানের জন্য ইতিবাচক না হলেও, তারা মার্কিন জনমতের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তেল আবিবকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার ফলে সৃষ্ট সংকট নিরসনে যদি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা যায়, তবে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। কারণ ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে হোয়াইট হাউস বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে চাইবে না।

সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে

লাইক লাইক 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
হাসি হাসি 0
বিস্ময় বিস্ময় 0
দুক্ষ দুক্ষ 0
রাগ রাগ 0