ইউরোপজুড়ে জেন-জির রাজপথের আন্দোলন: ক্ষোভের নেপথ্যে আবাসন সংকট ও বৈষম্য

২৫ অক্টোবর ২০২৬ - ১৭:৩০
4 মি. পড়ার সময়
সংবাদ শুনুন প্লে করতে ক্লিক করুন
ইউরোপজুড়ে জেন-জির রাজপথের আন্দোলন: ক্ষোভের নেপথ্যে আবাসন সংকট ও বৈষম্য
ছবি: সংগৃহীত

অনগ্রসর শিক্ষা খাত এবং তীব্র আবাসন সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী নানা সমস্যা সমাধানে ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি (জেনারেশন-জি)। মহাদেশটির বিভিন্ন দেশের রাজপথে তরুণদের এই ধারাবাহিক আন্দোলন ও আন্তঃপ্রজন্মীয় ক্ষোভ বর্তমান সরকারগুলোর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে এই অসন্তোষের পেছনে স্থানীয় ও নির্দিষ্ট কিছু কারণ থাকলেও এর মূল সুর এক। স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাজকালকে নিজ বাসস্থান থেকে উচ্ছেদের একটি ঘটনার জেরে দেশটিতে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। ফ্রান্সে শিক্ষক ধর্মঘটের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে রাস্তায় নামে শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে আলবেনিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনে একটি বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধে বেশ কয়েক মাস ধরে আন্দোলন চলছে।

​ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে শুরু হলেও এসব আন্দোলন এখন একই সূত্রে গাঁথা। স্পেনের আবাসন সংকটবিরোধী আন্দোলন এরই মধ্যে প্রতিবেশী দেশ পর্তুগালে বিস্তার লাভ করেছে। ইতালি ও গ্রিসের বিক্ষোভকারীরা ফরাসি তরুণদের আন্দোলনের বিভিন্ন স্লোগান নিজেদের মিছিলেও ব্যবহার করছেন। এ বিষয়ে ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র ইউনিয়ন ইউএনইএফ-এর সহ-সভাপতি অ্যালিস ডি ব্রিটো উল্লেখ করেন, বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের মধ্যে পার্থক্যের চেয়ে মিলের পরিমাণ অনেক বেশি। শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং আবাসন সংকটের মতো অভিন্ন বিষয় নিয়েই সবাই সোচ্চার হয়েছেন।

​একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে ইতালীয় ছাত্রনেতা সাবরিনা ব্রিজোলার কণ্ঠেও। এক সমাবেশে তিনি বলেন, আমাদের এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দরকার যা মাথার ওপর ভেঙে পড়বে না। একইসঙ্গে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মর্যাদাপূর্ণ পেশা, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুবিচারের দাবিও জানান তিনি।

​ইউরোপিয়ান করেসপন্ডেন্ট ডেইলি’র প্রধান সম্পাদক ইউলিয়াস ফিনটেলম্যানের মতে, এই বিক্ষোভগুলো ইউরোপীয় রাজনীতির কাঠামোগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে প্রারম্ভিক পর্যায়ের চাকরির সুযোগ কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সংকট তরুণদের হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, উদার গণতন্ত্রের যে প্রতিশ্রুতি ছিল যে পরবর্তী প্রজন্ম আগের প্রজন্মের তুলনায় উন্নত জীবন পাবে, তা আজ লঙ্ঘিত হচ্ছে।

​ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস, বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগালের অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ জাতীয় ঋণ পরিস্থিতির কারণে সরকারগুলোর পক্ষে বাজেট বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ফ্রান্সে গত বুধবার বন্ডের ফলন ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায় সরকারি বাজেটের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

​ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারার মতো কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অবশ্য ফরাসি পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের দেশের তুলনা করতে নারাজ এবং একে কট্টর ডানপন্থি তৎপরতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে বাস্তবতা হলো, ইতালি ও পর্তুগালে আবাসন সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। রোমের শিক্ষার্থী এলিসা বাস্তো জানান, তার পক্ষে ভাইয়ের সঙ্গে মিলে পড়াশোনার জন্য মাত্র একটি কক্ষের ভাড়াও মেটানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে পর্তুগালের লিসবনে হাজার হাজার মানুষ রাতে রাস্তায় তাঁবু টানিয়ে বাড়ির ভাড়া বৃদ্ধির ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ এবং উচ্ছেদ আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন।

​আলবেনিয়া ও সার্বিয়ায় এই আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে দুর্নীতিবিরোধী ও সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এডি রামা পদত্যাগের দাবি সরাসরি নাকচ করে এই সহিংসতাকে রাজনৈতিক বিরোধীদের চক্রান্ত বলে দাবি করেছেন। তবে আন্দোলনকারীদের একজন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তারা দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন চান এবং কোনো দীর্ঘ আলোচনার পরিবর্তে যত দ্রুত সম্ভব নতুন সরকার দেখতে চান।

​ইতিমধ্যে ফ্রান্সে ইউএনইএফ, কৃষক সমাজ, জলবায়ু কর্মী এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা সম্মিলিতভাবে বড় ধরনের সমাবেশ করেছে। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ৫ ও ১১ নভেম্বর ফ্রান্স ও স্পেনে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ৩১ অক্টোবর জার্মানিতে এবং আগামী ২০ নভেম্বর যুক্তরাজ্য ও ইতালিতে শিক্ষার্থী ইউনিয়নগুলোর বড় পরিসরে মাঠে নামার পরিকল্পনা রয়েছে।

সুত্র: সিএনএন

সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে

লাইক লাইক 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
হাসি হাসি 0
বিস্ময় বিস্ময় 0
দুক্ষ দুক্ষ 0
রাগ রাগ 0