জাপানে সমুদ্রের তলদেশে বিশাল স্বর্ণখনির সন্ধান, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কায় বিতর্ক

১১ জুলাই ২০২৬ - ১২:৫৩
3 মি. পড়ার সময়
সংবাদ শুনুন প্লে করতে ক্লিক করুন
জাপানে সমুদ্রের তলদেশে বিশাল স্বর্ণখনির সন্ধান, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কায় বিতর্ক
ছবি ঃ সংগৃহীত

প্রাকৃতিক সম্পদের খোঁজে মানুষের অবিরাম অভিযান যেন নতুন এক দিগন্তের উন্মোচন করল। জাপানের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের গভীর সমুদ্রে একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের মজুত খুঁজে পেয়েছেন দেশটির একদল গবেষক। বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তবে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় এই আবিষ্কারটি একই সঙ্গে পরিবেশগত মারাত্মক বিপর্যয়ের বৈশ্বিক বিতর্ককেও উসকে দিয়েছে।

​প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে টোকিও থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে জাপানের নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্তর্গত ‘হিগাসি-আওগাশিমা ভেন্ট’ নামক হাইড্রোথার্মাল ফিল্ডটি প্রথম শনাক্ত করা হয়। সম্প্রতি জাপানের স্বনামধন্য শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয় এবং টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা যৌথভাবে ওই অঞ্চলের পাথরের নমুনা বিশ্লেষণ করে এই স্বর্ণের সন্ধান পান।

​গবেষকেরা জানান, সমুদ্রের তলদেশের ওই আগ্নেয়গিরির মুখে বিশেষ কিছু কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী চিমনি বা ভেন্ট রয়েছে। এগুলো থেকে কেবল স্বর্ণের দৃশ্যমান ক্ষুদ্র কণাই ছড়াচ্ছে না, বরং তৈরি হচ্ছে এক ধরনের ‘অদৃশ্য স্বর্ণ’। অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকৃতির হওয়ায় সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও এই সোনা দেখা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা ‘সেকেন্ডারি-আয়ন মাস স্পেকট্রোমেট্রি’ নামক অতি সংবেদনশীল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ন্যানো কণার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন।

​এই অদৃশ্য স্বর্ণ মূলত লুকিয়ে রয়েছে ‘পাইরাইট’ নামক একটি সালফাইড খনিজের ভেতরে। লোহা ও সালফারের মিশ্রণে তৈরি এই চকচকে খনিজটিকে সাধারণ মানুষ ‘ফুলস গোল্ড’ বা ‘বোকার স্বর্ণ’ বলে অভিহিত করে। তবে জাপানি বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার প্রমাণ করেছে যে, এই বোকার স্বর্ণের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে আসল মূল্যবান সোনা। গবেষকদের মতে, পাইরাইটের ভেতরে স্বর্ণ শুধু ন্যানো কণা হিসেবেই আটকে নেই, খনিজের রাসায়নিক গঠনের ভেতরে একক পরমাণু হিসেবেও অবস্থান করছে। আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই বিশেষ খাদের স্বর্ণের ঘনত্ব এখন পর্যন্ত বিশ্বের যেকোনো স্থানে পাওয়া স্বর্ণের চেয়ে সর্বোচ্চ।

​ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে সমুদ্রের অন্যান্য খনির তুলনায় এই এলাকাটি তুলনামূলকভাবে কম গভীর এবং সহজে যাতায়াতযোগ্য। ফলে স্বর্ণ উত্তোলনের খরচ ও বাজারমূল্য বিবেচনা করলে এটি ভবিষ্যতের খনি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বাণিজ্যিক ক্ষেত্র হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

​তবে এই আবিষ্কারের খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদ মহলে উদ্বেগের ঝড় উঠেছে। বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সমুদ্রের তলদেশের এই সক্রিয় ভেন্টগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের (ইকোসিস্টেম) অংশ। এখানে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে খননকাজ চালানো হলে সমুদ্রের পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। মূলত পরিবেশগত ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতার কারণে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও সমুদ্রের তলদেশে বাণিজ্যিক স্বর্ণের খনি চালু করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে এই অদৃশ্য স্বর্ণ আহরণ করা যায়, তা নিয়ে নতুন প্রযুক্তির সন্ধানে কাজ করছেন গবেষকেরা।

সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে

লাইক লাইক 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
হাসি হাসি 0
বিস্ময় বিস্ময় 0
দুক্ষ দুক্ষ 0
রাগ রাগ 0