সংসদ যত সুন্দর চলবে, মানুষের হতাশা তত দূর হবে: বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান
জাতীয় সংসদকে দেশের বঞ্চিত ও সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, সংসদকে কার্যকর করার মাধ্যমেই দেশের মানুষের হতাশা দূর করা এবং হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ, সুষম উন্নয়ন এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকারের সুনির্দিষ্ট ও কঠোর উদ্যোগ দাবি করেছেন।
বুধবার (১৫ জুলাই ২০২৬) জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে জাতীয় সংসদের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এই সংসদ অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং এটি সাধারণ ও মজলুম মানুষের মিলনমেলা। সংসদের কার্যক্রম যত বেশি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হবে, দেশের মানুষের মন থেকে হতাশা তত দ্রুত কেটে যাবে। এতে মানুষের আস্থা বাড়বে এবং তারা দেশ গড়ার কাজে অনুপ্রাণিত হবে। এ সময় তিনি সংসদের অভিভাবক হিসেবে স্পিকারের ভূমিকা আরও বলিষ্ঠ করার আহ্বান জানান।
সম্প্রতি পাস হওয়া একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে অত্যন্ত জরুরি একটি বিল সংসদে পাস হয়েছে। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক যে, বিলটির ওপর বিস্তারিত আলোচনা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের সুনির্দিষ্ট সুযোগ থেকে বিরোধী দলকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে বিরোধী দলের সদস্যদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। অন্যথায় সংসদে উপস্থিতি ও জনগণের অর্থের অপচয় ছাড়া আর কোনো সুফল আসবে না বলে মন্তব্য করেন।
দেশের সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় ও ভূমিধসে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। এবারের বন্যায় চারটি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চট্টগ্রামের ক্ষয়ক্ষতি ছিল সবচেয়ে বেশি। নিহতদের পরিবারকে বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অর্থমন্ত্রী চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে এই বিপর্যয় কাটাতে বিশেষ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাজধানী ঢাকার ভঙ্গুর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও জলাবদ্ধতা নিয়ে কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকা শহর ময়লা ও ড্রেনের পানিতে তলিয়ে যায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই ময়লা পানি অনেক সময় সুপেয় পানির লাইনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ঢাকাকে দেশের ‘চেহারা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদেশি অতিথিরা ঢাকা দেখেই দেশ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেন। তাই ঢাকাকে তিলোত্তমা ও দৃষ্টিনন্দন করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধির প্রশংসা করার পাশাপাশি প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। প্রাথমিক স্তরে সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের জন্য নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ধর্ম মানুষকে সৎ, শালীন ও দেশপ্রেমিক হতে শেখায়। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং অবহেলিত স্বতন্ত্র মাদরাসাগুলোর উন্নয়নে নজর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার সংস্কৃতি বন্ধ করে সঠিক যোগ্যতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করার অনুরোধ জানান।
উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ এনে তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও আর্থিক পদক্ষেপে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি ইনসাফ করা হয়নি। সংরক্ষিত আসনের সরকারি দলের সদস্যদের বড় অঙ্কের ফান্ড বা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের কাউকেই তা দেওয়া হয়নি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনি ইশতেহারে সুষম উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবং আমরা সেই সুষম বণ্টনটাই প্রত্যাশা করি। রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে সাধারণ জনগণ যেন তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়টি তিনি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন।
সরকারি অর্থ অপচয় ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের নামফলক বসানোর রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকারি টাকায় কোনো ব্যক্তি বা রাজনীতিকের নামে স্থাপনার নামফলক বসানোর সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত। সরকারের পরিবর্তনের সাথে সাথে শত শত কোটি টাকার সরকারি সম্পদ নষ্ট করে নামফলক পরিবর্তনের এই অপরাজনীতি দেশের জন্য চরম ক্ষতিকর। কারও নামের মোহ থাকলে তিনি নিজের অর্থ ও জমিতে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে নাম দিতে পারেন, জনগণের টাকায় কোনো আত্মপ্রচার গ্রহণযোগ্য নয়।
দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা ‘দুর্নীতি’ নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়ে বর্তমান অর্থমন্ত্রীর পূর্ববর্তী সফল কর্মযজ্ঞের প্রশংসা করেন এবং তাকে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী যেখানে বলেছেন দুর্নীতির টুটি চেপে ধরবেন, সেখানে ডা. শফিকুর রহমান পরামর্শ দেন— আপাতত দুর্নীতির হাত চেপে ধরুন এবং হাতকড়া পরিয়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করুন, যাতে আর কেউ জনসম্পদ লুটের সাহস না পায়।
সবশেষে, জুলাই বিপ্লব ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান এবং সংসদ সচিবালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ ইনসেন্টিভ বা বোনাস প্রদানের জোর দাবি জানান।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে
লাইক
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
হাসি
0
বিস্ময়
0
দুক্ষ
0
রাগ
0











