নামের ভুলে ১০ মাস কারাবাস: নিরপরাধ আলমাসকে মুক্তির নির্দেশ হাইকোর্টের
নামের মিল ও ঠিকানার বিভ্রান্তির কারণে অস্ত্র মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে প্রায় ১০ মাস ধরে কারাগারে থাকা নিরপরাধ মো. আলমাসকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারিক অনুসন্ধানে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, কারাগারে আটক আলমাস আলোচিত ওই মামলার প্রকৃত আসামি নন। মূলত অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসল আসামি মো. আলমাছ বর্তমানে বিদেশে, অর্থাৎ কানাডায় অবস্থান করছেন।
আজ রোববার (৮ নভেম্বর ২০২৬) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানির দায়িত্বে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মহিউদ্দিন হানিফ। অন্যদিকে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আইনি আবেদনের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট তানভীর আহমেদ।
এর আগে গত ৫ নভেম্বর আদালতে দাখিল করা বিচারিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে জানানো হয়, অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত প্রকৃত আসামি মো. আলমাছ বিচারিক কার্যক্রমের শুরু থেকেই পলাতক ছিলেন এবং বর্তমানে তিনি কানাডায় প্রবাসী। অথচ নাম ও আংশিক ঠিকানার মিল থাকার কারণে তার বদলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করছেন ঢাকার দোহারের কুসুমহাটির বাসিন্দা শেখ খলিলের ছেলে মো. আলমাস। তিনি ওই মামলার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল মামলার প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. আলমাছের বাড়ি ঢাকার দোহার উপজেলার নয়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব ধোয়াইর গ্রামে এবং তার বাবার নাম খলিলুর রহমান। মিরপুর থানায় দায়েরকৃত একটি অস্ত্র মামলায় তার ১০ বছরের সাজা হয়। কিন্তু বাহ্রা ডাকঘরের অধীন এলাকার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এবং নামের মিল থাকায় পুলিশ ভুলবশত অন্য আলমাসকে কারাগারে পাঠায়।
এর আগে ন্যায়বিচার চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন ভুক্তভোগী মো. আলমাস। ওই আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদালত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে বিচারিক অনুসন্ধানের আদেশ দিয়েছিলেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান শেষে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আলমাসের ভুল গ্রেপ্তারের পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ ও অসংগতি উঠে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলার ফরোয়ার্ডিং লেটার, পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় আসামির ঠিকানা ও পরিচয় লিপিবদ্ধ করার সময় ত্রুটি ছিল। ২০০৭ সালের পূর্বে গ্রেপ্তার হওয়া আলমাস দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা গ্রামে বসবাস করতেন, আর প্রকৃত আসামির গ্রাম ছিল পূর্ব ধোয়াইর। এই আংশিক ঠিকানার মিল থেকেই মূলত বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া দুজনের পিতার নামেও আংশিক মিল পাওয়া যায়। কারাবন্দি আলমাসের পিতার নাম শেখ খলিল এবং পিতামহ শেখ নওয়াব আলী। পক্ষান্তরে, মামলার প্রকৃত আসামির এজাহারে পিতার নাম উল্লেখ ছিল খলিল আহম্মেদ এবং পিতামহের নাম শেখ শহর আলী।
পারিবারিক পরিসরেও তাদের মাঝে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। প্রকৃত আসামি আলমাছ তিন বোনের একমাত্র ভাই হলেও, কারাগারে থাকা আলমাসের দুই ভাই ও দুই বোন রয়েছে। পাশাপাশি দুজনের বয়সের ব্যবধানও স্পষ্ট। ২০০২ সালে প্রকৃত আসামির বয়স ২৪ বছর ধরা হলে বর্তমান বছর অনুযায়ী তার বয়স হওয়ার কথা প্রায় ৪৮ বছর। অথচ কারাগারে থাকা আলমাসের জন্ম ১৯৮৫ সালের ১০ ডিসেম্বর এবং বর্তমান বয়স প্রায় ৪১ বছর। ২০০২ সালে তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। অর্থাৎ দুজনের বয়সে প্রায় সাত বছরের ব্যবধান রয়েছে।
পাশাপাশি তাদের পেশা ও জীবনযাপনেও ভিন্নতা পাওয়া যায়। মামলার প্রকৃত আসামি মিরপুরের পাইকপাড়ায় বসবাস করতেন। আর ভুক্তভোগী আলমাস কৃষিকাজ ও ইলেকট্রিকের কাজ করে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতেন।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে
লাইক
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
হাসি
0
বিস্ময়
0
দুক্ষ
0
রাগ
0











