হরমুজ প্রণালিতে দরকষাকষির ক্ষমতা হারাচ্ছে ইরান: বৈশ্বিক বিকল্পে ভেস্তে যাচ্ছে তেহরানের হিসাব
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দিন দিন হারাচ্ছে ইরান। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করার হুমকি দিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের যে কৌশল তেহরান এতদিন ব্যবহার করে আসছিল, বিশ্বব্যাপী বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় তা এখন কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
বিকল্প রুটে স্বস্তি ফেরাচ্ছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার
জ্বালানি নজরদারি সংস্থা কেপলারের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে, যা যুদ্ধ পরিস্থিতির আগের স্বাভাবিক প্রবাহের প্রায় ৭৭ শতাংশ। সংঘাতের পূর্বে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত, বর্তমানে সেই সংখ্যা কমলেও তেল ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প পথ বেছে নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবাহ স্বাভাবিক রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যেই কার্যকর বিকল্প দাঁড় করিয়েছে। সৌদি আরব তাদের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সক্রিয় করে লোহিত সাগরের টার্মিনাল দিয়ে পুনরায় তেল রফতানি শুরু করেছে। এছাড়া জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের (শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার) মতো ব্যয়বহুল পদ্ধতি গ্রহণ করায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ প্রায় আগের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক বাজার এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ায় হরমুজ প্রণালি অচল করে ওয়াশিংটনকে অর্থনৈতিক ধাক্কা দেওয়ার ইরানের রণকৌশল কাজ করছে না।
দ্বিমুখী সংকটে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি
প্রণালির ওপর প্রভাব কমার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে তেহরান। মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের নিজস্ব তেল বিক্রি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে ইরান যেখানে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল তেল বিক্রি করত, গত আগস্টে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে প্রতিদিন ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫৫ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে।
এর ফলে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মান নজিরবিহীন দরপতনের মুখোমুখি হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে মিলছে ২৫ লাখেরও বেশি রিয়াল। ফলে ইরানে তীব্র মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
মিত্র চীনের অবস্থান ও আন্তর্জাতিক চাপ
ইরানের প্রধান তেল ক্রেতা চীনও প্রণালি উন্মুক্ত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বেইজিং সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই স্পষ্ট জানান, বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খল রক্ষায় হরমুজ প্রণালি দ্রুত উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন। প্রধান বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মিত্রের এমন বার্তায় আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে তেহরানের অবস্থান আরও নাজুক হয়ে পড়েছে।
তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক আলী গোলহাকী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর হরমুজ প্রণালিকে মূল আলোচনার বিষয় হিসেবে দেখছে না। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি জানিয়েছেন, তেহরান তাদের পারমাণবিক অবস্থান থেকে একচুলও সরবে না এবং বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা কেবল হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব কমলেও ইরানের হাতে এখনও পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার এবং ইয়েমেনের হুথিদের মতো আঞ্চলিক প্রক্সি মিত্রদের প্রভাব রয়েছে। তবে বাব আল-মানদেবে হুথি তৎপরতা বা নতুন সামরিক পদক্ষেপ কেবল নৌ-পরিবহন ব্যয়ই বাড়াবে, মার্কিন বা উপসাগরীয় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলে তা কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইরানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রণালিটির কৌশলগত গুরুত্ব টিকিয়ে রাখা, নাকি বিশ্বকে এটি ছাড়াই চলার পথ ত্বরান্বিত করতে দেখা।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে
লাইক
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
হাসি
0
বিস্ময়
0
দুক্ষ
0
রাগ
0











