স্মার্ট গ্লাসে নজরদারি ও যৌন হয়রানির অভিযোগ: ফ্রান্সে ফৌজদারি তদন্ত শুরু
প্যারিস: স্মার্ট চশমা বা 'স্মার্ট গ্লাস' ব্যবহার করে নারীদের গোপনে ভিডিও ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগে ফ্রান্সে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে প্যারিস পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির সামাজিক প্রভাব, নজরদারি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরির মুখে ফরাসি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রসিকিউটররা এই কড়াকড়ি শুরু করলেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড ও তদন্তের প্রেক্ষাপট
প্যারিস প্রসিকিউটর অফিস জানিয়েছে, জনসমক্ষে বা রাস্তায় হেঁটে যাওয়া নারীদের অনুমতি ছাড়া গোপনে স্মার্ট গ্লাসের মাধ্যমে ভিডিও বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশের একটি ট্রেন্ড চালু হয়েছে। এ সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়ার পরপরই অন্তত একটি ফৌজদারি মামলা রুজু করা হয়েছে। তবে এতে কোন নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে, তা পরিষ্কার করেনি কর্তৃপক্ষ।
সম্ভাব্য অপরাধমূলক ব্যবহার খতিয়ে দেখতে প্রসিকিউটরদের সাইবার ক্রাইম ইউনিট দুই সপ্তাহ আগে ডিভাইসটি পরীক্ষা করে দেখেছে। ফ্রান্সে সম্মতি ছাড়া গোপন ভিডিও বা ছবি ধারণের অপরাধে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা ৪৫,০০০ ইউরো (প্রায় ৫১,৭০০ ডলার) জরিমানার বিধান রয়েছে।
কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারের অভিযোগ ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
ফরাসি ডাটা সুরক্ষা সংস্থা সিএনআইএল (CNIL) জানিয়েছে, কর্মক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া স্মার্ট গ্লাস ব্যবহারের অভিযোগে তারা অন্তত ১০টির মতো লিখিত অভিযোগ পেয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তাদের অফিসে স্মার্ট গ্লাস নিষিদ্ধ করা যাবে কি না, তা জানতে চেয়ে সিএনআইএল-এর পরামর্শ চাইছে। সিএনআইএল-এর ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স প্রধান নাসেরা বেখাত বলেন, "স্মার্ট গ্লাসের মাধ্যমে কাউকে ভিডিও করার আগে তাকে অবহিত করা ও তার সম্মতি নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।"
স্মার্ট গ্লাসের অপব্যবহার রুখতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নানা পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে:
- যুক্তরাজ্য: সিনেমা হলগুলোতে স্মার্ট গ্লাস ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- জার্মানি: ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মেটা ও অন্যান্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ এনেছে দেশটির একটি ভোক্তা অধিকার সংস্থা।
- অস্ট্রেলিয়া: সরকারি কার্যালয়ে ক্যামেরা যুক্ত স্মার্ট গ্লাস নিষিদ্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে দেশটির সরকার।
বাজারের আধিপত্য ও অধিকারকর্মীদের উদ্বেগ
স্মার্ট গ্লাসের বৈশ্বিক বাজারে মার্কিন টেক জায়ান্ট মেটা (Meta) এবং চশমা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসিমোরলাক্সোটিকার (EssilorLuxottica) তৈরি স্মার্ট গ্লাসের একক আধিপত্য রয়েছে, যার বাজার শেয়ার প্রায় ৭৬ শতাংশ। প্রযুক্তিটিতে ক্যামেরা ও ভয়েস কমান্ডের সুবিধা থাকায় ব্যবহারকারী অতি গোপনে রেকর্ড করতে পারেন। গত বছর প্রায় ৭০ লাখ (৭ মিলিয়ন) ইউনিট মেটা স্মার্ট গ্লাস বিক্রি হয়েছে এবং ২০২৬ সালে এর বিক্রি আশাতীতভাবে বাড়ছে।
রেকর্ডিং চলার সময় ডিভাইসের ফ্রেমে ছোট একটি ইন্ডিকেটর লাইট জ্বলে উঠলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। ইন্টারনেট নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা 'ই-ইনফ্যান্সি'-এর আইনি বিশেষজ্ঞ ইনেস লেজেন্ড্রে বলেন, "কোনো গ্লাসে বাতি জ্বলে ওঠার মানে এই নয় যে, ওই ব্যক্তি ভিডিও হতে এবং পরে হাজার হাজার মানুষের কাছে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দিতে সম্মত হয়েছেন।"
নারী অধিকার সংগঠন 'হিউবারটাইন আক্লের্ট'-এর প্রযুক্তিভিত্তিক সহিংসতা বিষয়ক প্রকল্প পরিচালক ইনেস জিরার্ড বলেন, "রেকর্ডিং বন্ধের মূল দায়িত্ব টেক ইন্ডাস্ট্রিকেই নিতে হবে। যাদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে, উল্টো তাদেরই সব সময় সতর্ক থাকতে বলা যায় না।"
এ বিষয়ে মেটার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ডিভাইসের প্রাথমিক নকশা থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গোপনীয়তার সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সামনে এই সুরক্ষা আরও কঠোর করা হবে। তবে মেটার অংশীদার এসিমোরলাক্সোটিকা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে
লাইক
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
হাসি
0
বিস্ময়
0
দুক্ষ
0
রাগ
0











