পরিবেশের জন্য নতুন ঝুঁকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: অঢেল বিদ্যুৎ ও পানি গিলে খাচ্ছে এআই ডাটা সেন্টার

১৯ জুলাই ২০২৬ - ১৬:৫৮
প্রকাশিত: ৩ মাস আগে
5 মি. পড়ার সময়
সংবাদ শুনুন প্লে করতে ক্লিক করুন
পরিবেশের জন্য নতুন ঝুঁকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: অঢেল বিদ্যুৎ ও পানি গিলে খাচ্ছে এআই ডাটা সেন্টার
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও পানি গিলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, হুমকির মুখে বৈশ্বিক পরিবেশ | ছবি: এআই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের কাছে কোনো প্রশ্ন লিখে এন্টার চাপলেই মুহূর্তে উত্তর চলে আসে স্ক্রিনে। আপাতদৃষ্টিতে এই প্রক্রিয়া সহজ ও সাশ্রয়ী মনে হলেও এর অন্তরালে রয়েছে পরিবেশগত এক বিশাল সংকট। প্রতিটি জিজ্ঞাসার সমাধান খুঁজতে হাজার মাইল দূরের ডাটা সেন্টারে দিন-রাত কাজ করছে শক্তিশালী গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ)। আর এই বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ ঠান্ডা রাখতে এবং সচল রাখতে প্রতিনিয়ত অপচয় হচ্ছে অঢেল বিদ্যুৎ ও পানি। ২০২৬ সালে এসে এআই প্রযুক্তির এই লাগামহীন অতিব্যবহার পুরো বিশ্বের জন্যই অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ডাটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহার ২০২৬ সালে এসে দাঁড়াবে ৫৬৫ টেরাওয়াট-আওয়ারে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এই চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৪৫ টেরাওয়াট-আওয়ারে পৌঁছাতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই মডেল পরিচালনায় ব্যবহৃত একেকটি সার্ভার র‍্যাক সাধারণ সার্ভারের তুলনায় বহুগুণ বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে। উদাহরণস্বরূপ, এনভিডিয়ার ‘জিবি২০০’ চিপসমৃদ্ধ একটি একক র‍্যাক পরিচালনায় ১২০ থেকে ১৪০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়; যেখানে সাধারণ এন্টারপ্রাইজ র‍্যাকের জন্য মাত্র ১০ থেকে ১৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎই যথেষ্ট। ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী ডাটা সেন্টারগুলোর মোট বিদ্যুৎ খরচের ৩১ শতাংশই ব্যয় হবে শুধু এআই-অপ্টিমাইজড সার্ভারের পেছনে, যা এক বছর আগেও ছিল মাত্র ২০ শতাংশের কাছাকাছি।

বিদ্যুতের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পানির ব্যবহার। জিপিইউ ঠান্ডা রাখার জন্য বেশিরভাগ বৃহৎ ডাটা সেন্টার এখনো বাষ্পীভবন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল জানিয়েছে, ২০২৩ সালে তাদের ডাটা সেন্টারগুলোতে পানি খরচের পরিমাণ ছিল ৫০০ কোটি গ্যালনেরও বেশি, যার এক-তৃতীয়াংশই ব্যবহার করা হয়েছে তীব্র পানিসংকটে থাকা অঞ্চলগুলো থেকে।

একটি প্রশ্নের উত্তর তৈরিতে ঠিক কতটা পানি অপচয় হয়, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে অবশ্য ভিন্নমত রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ১০০ শব্দের একটি উত্তর তৈরিতে প্রায় আধা লিটার পানির প্রয়োজন হতে পারে। বিপরীতে ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের দাবি, এই পরিমাণ অত্যন্ত নজ্ঞ্য, যা প্রায় কয়েক ফোঁটার সমান। তবে এই বিতর্কের মধ্যেই নেদারল্যান্ডস কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার মতো অঞ্চলগুলোতে পানির হিস্যা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা এরই মধ্যে ডাটা সেন্টারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: সংকট ও সম্ভাবনা

বৃহৎ এআই মডেলগুলোর প্রশিক্ষণের মূল কাজগুলো উন্নত বিশ্বে সম্পন্ন হলেও বাংলাদেশে ডাটা সেন্টার শিল্পের বিকাশ ঘটছে প্রাথমিক পর্যায়ে। ২০২৫ সালে দেশের মোট ইনস্টলড আইটি লোড ছিল ২৩.৫৫ মেগাওয়াট, যা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১৫০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন। বিশেষ করে স্থানীয় ‘ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন’-এর কারণে সংবেদনশীল তথ্য দেশের ভেতরেই রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হওয়ায় দেশীয় কোলোকেশন ডাটা সেন্টারের চাহিদা বাড়ছে। তবে দেশের গ্রিডের অস্থিরতা এবং ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে অপারেটরদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে ব্যাকআপ ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী জানান, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট হলেও দৈনিক গড় উৎপাদন থাকছে মাত্র ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো যখন তাদের এআই-এর জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বন্ধ হয়ে যাওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে, বাংলাদেশও তখন তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘রূপপুর’ থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করার চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। আগামী আগস্টের মধ্যে রূপপুর থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে এবং ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বা ২০২৭ সালের শুরুতে তা ধাপে ধাপে ১,২০০ মেগাওয়াটের পূর্ণ সক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাবে।

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘ব্রিজওয়াটার’ সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, এআই খাতে পুঁজির এই বিপুল প্রবাহ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যে, প্রত্যাশিত চাহিদার ঘাটতি হলে পুরো খাত বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কার সম্মুখীন হতে পারে। তবে বিপরীতমুখী অন্য দলটি একে একটি উদীয়মান শিল্পের স্বাভাবিক রূপান্তরকালীন সংকট হিসেবে দেখছেন। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, গুগল ও মেটা যৌথভাবে শুধু ২০২৬ সালেই এআই অবকাঠামো উন্নয়নে ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করছে, যার একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে টেকসই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে। যেমন-মাইক্রোসফট পেনসিলভানিয়ার ঐতিহাসিক ‘থ্রি মাইল আইল্যান্ড’ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুনরুজ্জীবিত করার চুক্তি করেছে। একই সঙ্গে চিপ নির্মাতারা এমন সব উন্নত আর্কিটেকচার নিয়ে কাজ করছেন, যা সমপরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও বহুগুণ বেশি ডাটা প্রসেস করতে সক্ষম হবে।


সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে

লাইক লাইক 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
হাসি হাসি 0
বিস্ময় বিস্ময় 0
দুক্ষ দুক্ষ 0
রাগ রাগ 0